আমার চোখে সাতের রাত

Share this


৭ অক্টোবর ২০১৯, রাত প্রায় ৩ টা





"সোহেল, এই সোহেল, উঠ, উঠ তাড়াতাড়ি"





ইয়ামিনের ভয়ার্ত কন্ঠের ডাক শুনে আমার কাচা ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। মাত্রই ঘুমিয়েছি, তাই একটু বিরক্তির সুরে বললাম-





"কি হইছে?"
"আবরারকে মেরে ফেলছে"
"ধুর! কি যে কস না, ঘুমাইতে দে"
"সত্যি বলতেছি, উঠে দেখ বারান্দায় রাখছে"





আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারতেছি না, তখনও ঘুমের ঘোরে আছি। ইয়ামিন আমাকে ডাক দিয়েই বাহিরে গেছে আবরারের লাশের ওইদিকে। আরেক রুমমেট ফাহিম ভয়ে ভয়ে আমার বেডের পাশে এসে দাড়ালো, বললাম-





“কি হইছে রে? ইয়ামিন কিসব বললো“
“আবরার মারা গেছে”
"কি বলিস? সত্যি?"
"হ্যা, যা দেখে আয়"





মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে পড়লাম, নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।আমি তাড়াতাড়ি করে বের হয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে লাগানো মলম পরিষ্কার করে আসলাম। এরমধ্যেই মাহমুদ রুমে আসছে, অনেক ভয় পাচ্ছে (মাহমুদই আমাদের মধ্যে প্রথম দেখেছিল)। আমি একটু সাহস যোগাড় করে গেলাম হলের গেটের দিকে। একটা স্ট্রেচারে শোয়ানো আছে আবরারের মৃত দেহ। গায়ের উপর একটা চাদর আর মাথা গামছা দিয়ে বাধা। চারদিকে দাড়ায়ে আছে অনিক, জিসান, সকাল আর সেতু। আমাকে দেখেই জিসান বললো রুমে যাহ, আমরা আছি এখানে। ওখানে থাকার মতো আর সাহস পাচ্ছিলাম না, রুমে চলে আসলাম।





১০১০ নাম্বার রুমে থাকার কারণে রুমের দরজা থেকেই সব দেখা যাচ্ছিলো। আমরা ৪ জন রুমের দরজার সামনে দাড়িয়েই কি করা যায় তা নিয়ে কথা বলছিলাম। সিদ্ধান্ত হইলো যে ব্যাপারটা সবাইকে জানাতে হবে, কিন্তু আমরা ৪ জন মিলে কিছু করলে পরে আমাদেরও ধরবে। তাই আমাদের ব্যাচের যারা যারা হলে ছিল তাদের রুমে রুমে গিয়ে (২য় তলায় গিয়ে দেখি আহনাফ কান্না করছে, ও অনেক আগেই আবরারকে মারা যেতে দেখেছিল), ফোন করে, মেসেজ দিয়ে ১০১০ নাম্বার রুমে ডেকে আনলাম। মোটামুটি ১০-১৫ জন ছেলে আসার পর রুমের দরজা আটকায় দিয়ে ফেসবুকে দেয়ার জন্য পোস্ট লেখা হলো (লেখাটা এখনো আমার আলমারিতে তোলা আছে)।





আমরা কয়েকজন মিলে অনেক সতর্কতার সাথে পোস্ট লিখেছিলাম যেন পরবর্তিতে পোস্টের লেখার জন্য আমাদেরকে আবার না মারে, যেরকমটা দাইয়ান ভাইয়ের সাথে করেছিল। কেউ একা পোস্ট দিলে যদি আবার তাকে ধরে মারে সেই ভয়ে প্ল্যান করা হলো সবাই একসাথে সিএসবি, আড়িপাতা, হলের গ্রুপ আর নিজের ওয়ালে পোস্ট করবে, মারলে সবাইকে মারতে হবে, সবাই একসাথেই মার খাব দরকার হলে। রীতিমতো কাউন্টডাউন করে আমরা পোস্ট দিয়েছিলাম (ওইদিন সকালবেলাই ইসতিয়াক মুন্না জিজ্ঞেস করেছিল যে কে আগে পোস্ট দিয়েছে, আর রবিন আমাদের একজনকে বলেছিল কে আগে পোস্ট দিয়েছে সেটা আমি জানি, পোস্ট ডিলিট করতে বল, নাহলে ওর সমস্যা হবে। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, সিএসবিতে আমাদের প্রথম বেশ কয়েকটি পোস্ট এপ্রুভ না করে ডিলেট করে দেয়া হয়েছিল, পরে হয়তো তাদের প্রভাবক্ষেত্রের বাহিরের কোন এডমিন এপ্রুভ করে দিয়েছিল)।





ততক্ষণে ডিএসডব্লিউ স্যার, প্রভোস্ট স্যার সবাই হলে চলে আসছে। আমি গিয়ে দেখি ওনারা রাসেল (জিএস) এর সাথে কথা বলতেছে। আমরা সহকারী প্রভোস্ট স্যারের (ইফতেখার স্যার) কাছে গেলে উনি ডিএসডব্লিউ স্যারের সাথে কথা বলতে বলেন। আমরা স্যারকে ডেকে ১০১১ নাম্বার রুমে নিয়ে যাই কথা বলার জন্য। ইফতেখার স্যার রুমে সবাইকে ঢুকানোর পর দরজা আটকিয়ে দেয় যাতে আর কেউ আসতে না পারে। কিন্তু আমাদের কথা শেষ না হতেই রাসেল আর অনিক (খুব সম্ভবত) তাদের চেলাপেলাদের সাথে নিয়ে ইফতেখার স্যারের বাধা দেওয়া সত্ত্বেও জানালা দিয়ে দরজা খুলে জোরপূর্বক রুমে ঢুকে পড়ে। রুমে ঢুকেই ডিএসডব্লিউ স্যারকে বলেন যে পুলিশ আসছে, লাশ নিয়ে যাবে, কাগজে সাক্ষর করতে হবে আর তাদের সাথে কথা বলতে হবে, আপনি আসেন। ইফতেখার স্যার ওদেরকে পরে আসতে বলে, আমাদের সাথে কথা শেষ হলে তারপর স্যার যাবে বলে জানায়। কিন্তু ডিএসডব্লিউ স্যার আমাদের সাথে কথা শেষ না করেই পরে কথা বলবেন বলে চলে যান। এদিকে আমরা সবাই ১০১০ এর সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব দেখতেছি আর যতজনকে পারা যায় জানাচ্ছি। এইসময় আমাদেরই ব্যাচের ত্বোহা, বিল্লাহ, মোয়াজ আর মোর্শেদ (সবাই এখন জেলে) এসে তারা আবরারকে বাচাতে কি কি করছে সেগুলা বলতেছে, নিজেদেরকে জাস্টিফাই করতেছে। একপর্যায়ে আমাদের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পেরে চলে যায় ওরা। ইতোমধ্যে আমরা জানতে পারি যে আবরারের মৃতদেহ গুম করার চেষ্টা করা হচ্ছে।





তাই আমাদের মধ্যে একজন গিয়ে লুকিয়ে আবরারের কিছু ছবি তুলে কয়েকজনকে অনলাইনে পাঠিয়ে দেয়, পরবর্তীতে দরকার পড়লে যেন প্রমাণ দেখানো যায়। আমার মনে আছে, এরপর মাহমুদ,আমিসহ আরও কয়েকজন মিজানের (আবরারের রুমমেট) সাথে কথা বলি, উনি কান্না করতেছিলেন কিন্তু আমাদেরকে তার ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে কিছুই জানান নাই (তখনো আমরা তাকে নির্দোষ ভাবছিলাম)। একসময় আবরারের লাশ হলের গেট থেকে ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া হয় আর আমাদেরকে সেখানে যেতে মানা করে প্রশাসন। তাই আমরা সবাই ১০১০ এ বসে কি করা যায় সেগুলা নিয়ে কথা বলছিলাম। সাখাওয়াত অভি, মহিউদ্দিন, ফুয়াদসহ আরো কয়েকজন কান্না করতেছিল। ওদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টাও করছিল কয়েকজন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা আর অবস্থা একজনেরও ছিল না। সবাই ভীত আর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ছিল। ফেসবুকের পোস্ট দেখে বা ফোন পেয়ে অথবা অন্যকোনোভাবে জানতে পেরে সকালের দিকে অন্যান্য হল থেকে ধীরে ধীরে সবাই আসা শুরু করে। কিছু পত্রিকাও চলে আসে ততক্ষণে। তখনও হত্যাকান্ডে জড়িত প্রায় সকলেই হলেই ছিল, হয়তো ভেবেছিল তাদের আবার কে ধরবে অথবা তারা হয়তো কোন অপরাধই করে নাই, নাহলে একটা মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার পরও কেউ অতটা শান্ত থাকে কিভাবে?






সকাল হয়ে গেছে, পুলিশের কাছে লাশ হস্তান্তর করার সকল প্রশাসনিক কাজও শেষ। আরাফাত আর কে কে যেন পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিচ্ছিল আর বাকিরা ক্যান্টিনের আশেপাশেই দাড়িয়ে আছে। হঠাৎ স্ট্রেচারের কচকচ শব্দে সকলের মনোযোগ ক্যান্টিনের দরজার দিকে ঘুরে গেল। দরজা দিয়ে বের করা হচ্ছে আবরারের লাশ (আসলে সেটা তো ছিল বুয়েটের লাশ)। আমরা সবাই স্ট্রেচারের পিছে পিছে জিমনেসিয়াম পর্যন্ত গেলাম, লাশ পুলিশের গাড়িতে তোলা হলো, পুলিশের সাথে হল থেকে কে যাবে সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনার পরে প্রভোস্ট স্যার গেলেন। পুলিশের গাড়ি আস্তে আস্তে চলতে শুরু করল আর আমরা সবাই করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি গাড়ির দিকে। গাড়ি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই শুনতে পেলাম পুলিশ নাকি রাসেল আর ফুয়াদকে (লীগের) ধরে নিয়ে গেছে।এভাবেই বুয়েটের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত রাতের অবসান হয়েছিল, যে রাতের ক্ষতি বুয়েট সারাজীবন চেষ্টা করলেও পূরণ করতে পারবে না।