মুক্তির গল্প

Share this


বুয়েটে ক্লাস শুরু করার পর আমার সবথেকে বিরক্ত যে জিনিসগুলো লাগত তার মধ্যে একটা হচ্ছে “বুয়েটের মাটি ছাত্রলীগের ঘাটি” শ্লোগান টা। হলে থাকার কারণে ছোট বড় যেকোনো মিছিলেই সবার যাওয়াটা বাধ্যতামূলক ছিল যার জন্য শুরুর দিকে বাধ্য হয়েই যাওয়া লাগত। আর যেহেতু আমার গলার আওয়াজও অনেক উচু এটা মোটামুটি সোহরাওয়ার্দী হলের সবাই জানত, তাই মাঝেমধ্যে শ্লোগান দিতেও হয়েছিল। তখন এই শ্লোগানটার প্রতি ক্ষোভ কোন লেভেলের ছিল তা বলে বোঝানোর মত না।





তাই ১১ তারিখ রাতে অবশেষে যখন ভিসি স্যার তার মুখ থেকে ঠিক এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেন যে “আমি আমার নিজস্ব ক্ষমতাবলে এই মুহুর্তে বুয়েট থেকে সকল সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি”, তখন আমার খুশির শেষ ছিল না! হ্যা টেনশন ছিল যে এই মুখের বলি আর ঠিক কতদিন টিকবে। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের কমবেশি সবার জন্যই সেই মুহুর্তটা অন্যরকম ঐতিহাসিক ছিল।





সেদিন একদম সকাল থেকে প্রচুর ধকল যাওয়ার জন্য প্রচন্ড টায়ার্ড ছিলাম। বিশেষ করে ভিসি স্যার তার নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপরে। ব্যপারটা খুবই উইয়ার্ড যে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তার নিজ ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার জন্য শিক্ষার্থীদের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন। আমার মনে হয় তিনি নিরাশ হননি। তার নিরাপত্তার জন্য তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ১৭ ব্যাচ থেকে আমরা পেশ করি পৌনপুনিক ১৫ এর কাছে।





আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমাদের প্ল্যানগুলো বলার সময় সৌমেনদা বলেছিলেন, “তোরা যে ভিসিকে এরকম NSI লেভেলের নিরাপত্তা দেয়ার প্ল্যান করতেছিস, এটা করতে পারবি তো?” আমরা পারছিলাম! সেদিন ভিসি স্যার চলে গেলে আমি ১৭ ব্যাচের আরো কিছু বন্ধুসহ লীগকর্নারে যাই। এই জায়গাটা তারা ব্যবহার করত নিজেদের রাজনৈতিক মিটিং এর জন্য। সেখানে আমাদের আগেই কেউ এসে ছাত্রলীগের লোগো এবং নাম মুছে দিয়েছিল।





নিজেদের ঘৃণার জায়গা থেকে আমরা আরো কয়বার সাদা রঙ এবং তুলি নিয়ে সদ্য মিশে দেয়া লোগোর উপর ঘষামাজা করি। কেউ একজন লীগকর্নারের পাশের কাঁচের দেয়ালটাতে খুব সুন্দর করে মুক্তিকর্নার লিখে দিয়েছিল। আসলেই তো সেদিন মুক্তি মনে হয়! আমার জন্য মুক্তি ছিল এই যে এরপর থেকে আর বুয়েটের মাটিকে ছাত্রলীগের ঘাটি নাম শুনতে হবে না। এটা তো সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঘাটি, তাই না? কিভাবে কোনো রাজনৈতিক দল জায়গাটাকে একদম নিজেদের ঘাটি বলে দাবি করে বসে? সেদিন হলে যখন ফেরত আসি, দেখলাম ডাইনিং এ এক বড় ভাই বুয়েট থেকে হলে হলে দেয়া নোটিশ গুলো থেকে একটা একটা করে নিয়ে যাচ্ছে।





এখানে ১৯ ব্যাচের জন্য একটু বলি, বুয়েটে সাধারণত কোনো নোটিশ আসলে সেটা হলে হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটা করে হিসাবে পাঠানো হত। সোহরাওয়ার্দী হলে সেগুলো সব ডাইনিং এ এক জায়গায় রাখা হত এবং যার ইচ্ছা সে নিয়ে যেত। আমি ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম যে এগলো নিয়ে কি করবেন, নোটিশ তো জানাই আছে। ভাই বললেন “এগলো লেমিনেটিং করে দেয়ালে ঝুলায় রাখব”। আসলেই বুয়েটের তৎকালীন রাজনীতির প্রতি মানুষের ক্ষোভের লেভেল কতদুর ছিল তা বুঝা যায়। সেদিন বারবার মনে হচ্ছিল রাজনীতি তো গেল, বাকি দাবিগুলোও হয়ত পূরণ হবে, বিচারও হয়ত হবে। কিন্তু এসব কার জন্য হলো?





ফাহাদ যদি মারা না যেত, তাহলে সিচুয়েশন পুরো উলটো হত না কি? শিবির সন্দেহে পিটিয়ে হল থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা তো আসলে একটা না, আরো ছিল। ভাগ্যটা খারাপ শুধু ফাহাদের, তাকে মরতে হয়েছে। তার জীবনের মূল্য দিয়ে ক্যাম্পাস থেকে রাজনীতি নামের যেই কীট ছিল সেটা দূর করা গেছে। আমার মনে হয় এই ব্যপার টা সবার নিজেদের মধ্যে অনুধাবন করা উচিত। এবং বছরের পর বছর এই অনুধাবন টা যদি টিকে রাখতে পারি তাহলেই শুধুমাত্র ক্যাম্পাস ভবিষ্যতেও রাজনীতি মুক্ত থাকতে পারবে।