ভ্রাতৃত্বের গর্জন

Share this


৭ অক্টোবর, ২০১৯





সময়টা ঠিক মনে নাই। বিকাল ৫ টা বাজে হয়তো।





পুলিশের কিছু কর্মকর্তা হল প্রভোস্টের রুম থেকে বের হয়ে আসলেন। সাথে সাথে সবাই ঘেরাও করলো তাদের। দাবি একটাই। ভিডিও ফুটেজ এখনই ছাত্রদের হাতে হস্তান্তর করতে হবে। উনারা বিভিন্ন জিনিষ বুঝানোর চেষ্টা করতে থাকলেন। "এটা তো এভাবে করা যায়না। দেশে তো এখনো আইন আছে"। এক মুহুর্তেই সবাই বুঝে গেলো উনারা আসলে কি করতে চাচ্ছেন।





সময় যাচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মুখ থেকে কিছু বের হয় সাথে সাথে আরোও বেশি ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ঘেরাও করে ধরে। এক পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তা বলে উঠলেন, "তোমরা যদি এতোই চাও তাহলে কয়েকজন আমার সাথে থানায় চলো। ওইখানে ফুটেজের একটা কপি করে তোমাদের হাতে দিয়ে দিবো।" সাথে সাথে সবাই একসাথে হৈচৈ করা শুরু করলো। এ তো হতে দেওয়া সম্ভব না একদমই। সবাই একরকম ধস্তাধস্তি করেই পুলিশ কর্মকর্তাদের ধরে হল প্রভোস্টের রুমের দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। কারোও মনে কোনো ভয় নাই। দাবি একটাই। ভিডিও ফুটেজ এখনই ছাত্রদের হাতে হস্তান্তর করতে হবে। জোর জবরদস্তি করেই পুলিশ কর্মকর্তাদের হল প্রভোস্টের রুমে যেতে বাধ্য করা হলো। ঠিক ওই মুহুর্তে ছাত্র-ছাত্রীদের চেহারায় যে আবেগ দেখা যাচ্ছিলো তাতে মনে একটা আশ্বাস পাওয়া পেয়েছিলাম " নাহ খুনিরা পার পাবেনা। এইবার না।"





সন্ধ্যা ৭ঃ৩০ এর দিকে





এখনো হল প্রভোস্টের রুমে বন্দী পুলিশ কর্মকর্তারা। এদিকে শেরে বাংলা হলের বাহিরে একের পর এক পুলিশের গাড়ি ভরে রায়োট পুলিশ আসতে থাকলো। এদের সংখ্যা এতো বেশিই ছিলো যে এক পর্যায়ে ছাত্র- ছাত্রী থেকে এদের সংখ্যাই বেশি মনে হচ্ছিলো। একে একে হলের করিডোর গুলায় ভরে গেলো পুলিশ। হাতে লাঠি। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রী কারোও মনে কোনো ভয় নাই। রায়োট পুলিশ বাড়তে থাকলে হল প্রভোস্টের অফিসের গেইটে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। একটা জিনিষ এখানে বলা দরকার। হল প্রভোস্টের অফিসের আশেপাশের সব বের হওয়ার রাস্তা ছিলো বন্ধ। যদি রায়োট পুলিশ হঠাত করে লাঠিচার্জ শুরু করতো তাহলে পালানোর রাস্তাও ছিলোনা। এসব জানতো সবাই। তবুও এক ফোঁটা নড়বে না কেউ৷ পুলিশেরা বাঁশি বাজানো শুরু করলো, লাঠির আওয়াজ করা শুরু করলো। কেউ এক কদম সরলো না। পুলিশেরা হল প্রভোস্টের অফিসের গেইটের দিকে ছাত্রদের হাল্কা চাপ দেওয়া শুরু করলো। কেউ সরলো না। ভিডিও ফুটেজ ছাড়া যাবেনা। পুলিশেরা ভয় দেখাতে থাকলো। লাভ হলোনা। ছাত্ররা অবস্থান ছাড়লো না।





এদিকে হল প্রভোস্টের অফিসে দফায় দফায় ছাত্রদের প্রতিনিধি প্রবেশ করে। ভিতর থেকে বিভিন্ন প্রস্তাব আসতে থাকে। মানবে না কেউ। দাবি পরিষ্কার। ভিডিও ফুটেজ ছাত্রদের হাতে দিতে হবে এখনই।





পুলিশের হুমকি আর ভয় দেখানোর এক পর্যায়ে রায়োট পুলিশেরা ছাত্রদের দিকে আগানো শুরু করলে সব ছাত্র একত্র হয়ে পুলিশদের পিছনে ধাক্কাতে থাকে। যতো বেশি পুলিশ এসে জমা হয় তার চেয়ে বেশি ছাত্ররা এসে জমা হয়। এক পর্যায়ে ছাত্ররা ধাক্কা দিতে দিতে প্রায় কয়েকশ রায়োট পুলিশকে হল থেকে বের করে দিয়ে হলের গেইট বন্ধ করে দেয়। দেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল।





শেষ পর্যন্ত আর কোনো কিছু করতে না পেরে বাধ্য হয়ে ভিডিও ফুটেজের একটা কপি স্টুডেন্টদের নিতে দেওয়া হয়। আবার আরোও বড় একটা আশ্বাস পেলাম " নাহ খুনিরা এবার পার পাবেনা।"





পুলিশ কর্মকর্তার কথা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে তাদের এভাবে জোর জবরদস্তি করে হল প্রভোস্টের অফিসে এভাবে আটকে রাখা থেকে শুরু করে রায়োট পুলিশের ধমকাধমকিতেও এক কদম না পর্যন্ত ওই একটা দিন বুয়েটের ছাত্র-ছাত্রীরা যেরকম সাহস দেখিয়েছিলো তা আমার কাছে আমাদের দেশের ইতিহাসের ছাত্র-ছাত্রীদের বীরত্বের ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। নিজের চোখের সামনে হওয়া সব ঘটনা। এভাবে একত্র হয়ে ওইদিন শেরে বাংলা হলে হল প্রভোস্টের অফিসের বাহিরে যারা ছিলো তারা যা করতে পেরেছিলো তা এক শব্দে "inspiring"