জায়গার নাম আজ মুক্তি কর্ণার

Share this


আমি খুব গুছায় লিখতে পারি না। এলোমেলো কিছু কথাবার্তা শেয়ার করব।





আবরারের সাথে কোনদিন কথা হয় নাই। চিনতাম না সামনাসামনি। খবরটা শুনে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি নাই। টিভিতে আবরারের মার কান্না দেখে মনে হচ্ছিল আজকে যদি আমি আবরারের জায়গায় থেকে মারা যাইতাম, আমার ফ্যামিলি কি করত? আমার বাবা মা দুইজনই অসুস্থ। সারাদিন এত দুশ্চিন্তা, ব্যস্ততা, কাজের টেনশন। এর মধ্যে ছেলে ভার্সিটির হলে নির্মমভাবে খুন হয়েছে। কিভাবে নিত আমার আব্বা। ওইদিন বিকালে যখন আবরারের বাবা আসবে শুনতেসিলাম, আমি খালি বারবার আবরারের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতেসিলাম। আমি মারা গেসি। আমার আব্বা আসলো। প্রভোস্টের রুমে সিসিটিভি ফুটেজে দেখতেসে কিভাবে তার প্রাণপ্রিয় সন্তানের লাশ সরানো হচ্ছে। আমার আব্বু কিভাবে নিত? এগুলা ভাবতে ভাবতে চোখে পানি এসে পরতেসিল।





আমি একজন এটাচড ছিলাম। হলে দুই তিনরাত থাকা ছাড়া অভিজ্ঞতা নাই। হল, হলের পরিবেশ, বুয়েট এসব নিয়ে এত আবেগ বা মাথাব্যথা কোনদিন ছিল না। বুয়েটের ব্যাচের নেতৃত্ব সংশ্লিষ্ট কাজেও কোনদিন প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম না। এই ঘটনার পর আসলে কি জানি হইসিল। বাসা থেকে মিথ্যা বলে, চলে আসবো বলে বুয়েটে আসতাম। রাতে বাসায় যেয়ে আব্বা আম্মার সাথে ঝগড়া করতাম। তাঁরা আমার নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পাইতেন। আমার কাছে তখন সবকিছুই তুচ্ছ, মিথ্যা, অপ্রয়োজনীয় মনে হত। জীবনের মূল্য এত সস্তা। এই সিজিপিএ, পড়াশোনা এসব করে কি করব? জীবনের নিশ্চয়তা নাই যেখানে।





আন্দোলন শুরু হল। দেখলাম আমার মতই সাধারণ কিছু মানুষ কিভাবে অসাধারণ হয়ে উঠল। সামনে থেকে দেখলাম সানিম, তিথী, সায়েম, দাইয়্যান, সৌম্য, শাকিল সহ ব্যাচের আরও কয়েকজন মানুষকে। এরা অবশ্য আগে থেকেই অসাধারণ ছিল। কিন্তু এই ঘটনা যেন ওদের আরও অসাধারণ করে তুলসে। কি বিচক্ষণ একেকজনের চিন্তাভাবনা। জুনিয়র ব্যাচ থেকেও সব অসাধারণ মানুষগুলার উত্থান দেখলাম। এ যেন নতুন বুয়েট। তখন থেকে শপথ নিলাম। জান গেলে যাবে, এই মানুষগুলাকে যতখানি সম্ভব সাপোর্ট দিব।





এরপর কয়েকদিন গেল। বুয়েটে আমার দেখা এই প্রথম কোন আন্দোলন চেইন অফ কমান্ড ভেঙ্গে সকল ব্যাচের সবার অংশগ্রহণে হল। জনআন্দোলন, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। ভিসি স্যার যেদিন রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেন, ওইদিন ক্যাম্পাসে আর্কির প্রতিভাবান মানুষগুলা দেয়াল রং করে প্রতিবাদ জানাচ্ছিল। অডি থেকে বের হয়ে আসলাম লীগ কর্নার নামক জায়গাটায়। এসে দেখি এক বালতি সাদা রং আর একটা ব্রাশ। আমি আর অদ্রিকা ছিলাম ওখানে। ব্রাশ রং দেখে লোভ সামলাতে পারি নাই। দুইজন মিলে তখনই লীগ কর্ণার থেকে ছাত্রলীগের নাম আর লোগো মুছে জায়গাটা কলংকমুক্ত করি। তিথি পরে আমাকে বকা দিসিল ওকে কেন ডাকলাম না। মোছার আগে একটু ইতস্ততবোধ করছিলাম, অদ্রিকা বলল আরে করে ফেল। করার পর এক অদ্ভূত প্রশান্তি কাজ করতেসিল। মনে হচ্ছিল অনেকদিনের জঞ্জাল সাফ করলাম। এ যেন অনেক বড় একটা কাজ করে ফেলসি।





এমন সময় ওখানে ১৫ এর আরও কয়েকজন আসে। জায়গাটার নতুন নাম সাজেস্ট করতে থাকে। পরে ঠিক হয় এই জায়গার নাম আজ থেকে মুক্তি কর্ণার। আমাদের ব্যাচের শুভ ছিল, ও তখনই রং ব্রাশ নিয়ে জায়গাটার নাম লিখে মুক্তিকর্ণার বানায় দেয়।





আমরা রং করে চলে যাওয়ার পর সম্ভবত ১৭ ব্যাচের কয়েকজন এসে আবারও ওইখানে রং করে। এইটা নিয়ে মেবি ভুল বুঝাবুঝি হইসিল। গতকাল পোস্ট করসিল একজন, ও আমার সাথে ইনবক্সে যোগাযোগ করসে। আসলে রাজনীতি নিষিদ্ধ শুনে অল্পকিছু মানুষ বাদে বাকি সবাই খুশি ছিল। কি পরিমাণ ক্ষোভ, ঘৃণা আর বিরক্তি ছিল বুঝা যায়। তাই বুয়েটের কলংক ছাত্রলীগের চিহ্ন মুছার সুযোগ যে পাইসে ব্যবহার করসে। এর কয়দিন পরেই দেখি কে জানি শহীদ মিনারের সামনে ছাত্রলীগের নাম আর লোগো রং দিয়ে মুছে দিসে। কে করসিল ওটা সেটা এখনও জানি না। কিন্তু মনে মনে খুশি হইসিলাম।





এক আবরার মরার পর বুয়েটে এমন পরিবর্তন এসেছে। হলগুলায় পরিবর্তন আসছে। র‍্যাগিং বন্ধ হইসে। ১৯ ব্যাচ কল্পনাও করতে পারবে না বুয়েটের কি অবস্থা ছিল। ১৯ ও পরবর্তী ব্যাচগুলার কাছে অনুরোধ, আমরা চলে যাব কয়দিন পর। ২০-২১-২২-২৩ এসব ব্যাচের কাছে আবরার একটা রূপকথা হয়ে থাকবে। তোমরা প্লিজ বুয়েটে পলিটিক্সের মত বিশ্রী জিনিস আর আসতে দিও না। আর কোন আবরারকে যাতে না হারাই।





দোষীরা জেলে। আশা করি বিচার হবে। হতেই হবে।