আগে চড়েছিল ছোট্ট আমিটা, এবারে আমার লাশ

Share this


আবরারের কথা আমি শুনি শেখেরটেকের বাসায়। ঠিক তার আগের দিন, ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে আমি শেরে বাংলা হল ছেড়ে বলা চলে এক প্রকার পালায় আসছিলাম। আমি ফেসবুকে হলের ডাইনিং এর টাকা মারা নিয়ে একটা ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখেছিলাম। সেখানে আমাদের হলের যারা কমেন্ট করেছিল, তাদের সবাইকে ডাকা হয়েছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। আমাকে রাত ১২ টার পর ২০০৫ নং রুমে ডাকা হয় যেখানে ছিল রবিন, জিয়ন আর একজন। খুব বেশি কিছু হয়নি, আমার চশমা ভাঙ্গার মধ্য দিয়েই পার পেয়ে যাই। কিন্তু হলে থাকার মতো মানসিক শক্তি ছিল না। তাই রাত ৩ টার দিকে আমি আমার সাইকেল নিয়ে বের হয়ে পড়ি আর বাসায় এসে উঠি। সেদিন মনোবিদ দেখিয়ে এসে ঘুমিয়ে পড়ি আর ভোর ৬ টায় একজনের ফোনে ঘুম ভাঙ্গে,






- হ্যালো, তুই কোথায়?
- আছি, কী হইছে?
- জানিস, হলে একজনকে মারে ফেলছে






খবরটা হজম করা আমার জন্য অনেক কষ্টকর ছিল। কারণ মেরে ফেলা যা তা কথা না। তার উপর ঠিক আগের রাতেই আমি তেমন একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে আসছি।
- কী বলতেছিস এগুলা?
- হ্যাঁ, আজকে রাতে পিটায় একজনকে মারে ফেলছে। জুনিয়র
- আচ্ছা, ঠিক আছে, দেখতেছি।





আমি উঠে বসি। আমার মাথা প্রায় চিন্তাশূন্য হয়ে যায়। এসব আমার জন্য অনেক বেশি ছিল। আমি ফেসবুকে ঢুকি। তারপর লিস্টের ১৭ এর একের পর এক পোস্ট চোখে আসতে থাকে, আমি সবগুলো পড়ি। ক্যাম্পাসে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করি। আর যখন নিশ্চিত হই যে ঘটনা সত্য, আমি মানসিকভাবে পুরো ভেঙ্গে পড়ি। যারা আমাকে চিনে তারা জানে, সাধারণত আমি কিছু নির্দিষ্ট দিকে মানসিকভাবে অনেক শক্ত থাকি। কিন্তু আবরার... আবরার আমার সব শক্তি কেড়ে নেয়।






আমি আবরারের প্রোফাইলে ঢুকি। দেখি, এই ছেলে আমার লিস্টে ছিল। আমি তার সকল লেখা দেখেছি, যে পোস্টের জের ধরে তাকে মারা হয়েছে, সেটাও আমি দেখেছি। এবং আমার স্পষ্ট মনে আছে, পোস্টটা যখন আমি পড়ছিলাম তখন আমার মনে হয়েছিল একে বলা দরকার যেন এমন কিছু না লেখে। কিন্তু তারপর আবার নিজেকে এই বলে সায় দিয়েছি, নাহ, এখানে ও কাউকে গালিগালাজ করে নি, মিথ্যে কিছু লেখে নি, হয়তো কিছু হবে না। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম, অনেক বড় ভুল ছিলাম...





আমার সাথে আবরারের কখনো সামনাসামনি কথা হয়নি। কিন্তু কেন যেন আমি তাকে অনুভব করতে পারি। সে ভয়াল রাতে তার কেমন লাগছিল, সে এই দেশকে কতটা ভালোবাসতো, তা আন্দাজ করতে পারি। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমার কল্পনাশক্তি থমকে যায়, বিশেষ করে অনিকের বলা এই কথাটা," আজ আমি তোকে মারবো, তারপর তোর ছোট ভাইকে আমার ছোট ভাই দিয়ে মারাবো"...





কল্পনা কর, তুমি এমন একটা অসহায় অবস্থায় আছো, তোমার সারা গা ব্যথায় অবশ হয়ে আসছে, তুমি বুঝতেছ না আর কোনদিন তোমার পরিবারের কারো সাথে তোমার দেখা হবে কী না, এমন সময় তোমার সামনে একটা মানুষরূপী পিচাশ (যাকে নিয়ে আমি একসময় অনেক আশাবাদী ছিলাম...) তোমার সবচেয়ে আদরের ছোট ভাইকে নিয়ে হুমকি দিচ্ছে, তাকে মেরে ফেলার কথা বলছে। যে ভাইকে তুমি নিজে কখনো কিছু হতে দেও নি, প্রাণপণে আগলে রেখেছ, আর এখন শুনছো যে তাকেও তোমার মতো পরিণতি বরণ করতে হবে, এবং, হয়তো তুমি সেখানে উপস্থিত থাকতে পারবে না, হয়তো তুমি জানতেও পারবে না যে আদৌ এটা হবে কি না, তোমার কেমন লাগবে?
ভাবতে পারো?





দেখ, রাজনৈতিক আদর্শ থাকতেই পারে, নিজের পছন্দ অপছন্দও থাকতে পারে। কিন্তু, যখন এমন কোন ঘটনা ঘটে, আর তারপরেও একজন প্রতিবাদ করে না আর পারলে সে ঘটনার সমর্থনে কথা বলে, তখন আমার কেন জানি তাকে ন্যূনতম সম্মানটাও দিতে ইচ্ছে করে না।





আজ আবরারের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে একটা নিরাপদ ক্যাম্পাস পাওয়া গেছে। আমরা যারা এই নিরাপদ ক্যাম্পাসের সুবিধা ভোগ করছি, তাদের মনে রাখা উচিৎ প্রতিটা ঘটনা, প্রতিটা আত্মত্যাগ আর সেই ভয়াল রাতের প্রতিটা কাহিনী। সেই সাথে তখনকার খুনীদের সহযোদ্ধাদেরও চিনে রেখ, যারা তাদের সাথে উঠেছে, বসেছে, খেয়েছে এবং কেবলমাত্র কপালগুণে এমন একটা কাজে জড়ানো থেকে বেঁচে গেছে। তাদের চিনে রেখে সাবধান থেকো। আর, নিজেরা যখন আরো বড় হবা, ভালো ভালো জায়গায় যাবা, কখনো এমন দানব হয়ো না। মনে রেখ, তুমি মানো বা না মানো, তোমার ভালো জায়গায় যাওয়ার পিছে একটা আবরারের জীবন থাকবে। সেই জীবনের মান রেখো।





আর কী বলবো, কী বলা যায়...





এই ছবিটা সাথে দিয়ে দিলাম। তখন এটা অনেক শেয়ার হয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে এই ছবিটা পরম আপন কোন জায়গা মনে হয়। কষ্টের মাঝেও কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়, এই ছবিটা আমার জন্য সেই বস্তু। সাথে বাক্যগুলোও যোগ করে দিলাম, ছবিটার দিকে তাকিয়ে চরণগুলো পড়িও, আশা করি, বুঝতে পারবে...





"দুমড়ে মুচড়ে স্বপ্নের মালা, আকাশ ছোঁয়ার সাধ
প্রিয় বাবা, তুমি প্রস্তুত করো তোমার চওড়া কাঁধ।
আগে চড়েছিল ছোট্ট আমিটা, এবারে আমার লাশ।
মুখোশে মুখোশে মানুষের সাথে শুয়োরের বসবাস।"





Image may contain: 2 people, sunglasses