৮ অক্টোবর, ২০১৯

Share this


আবরার ফাহাদ হত্যার পরেরদিন। বুয়েটের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের গতিবিধি এবং সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় এই দিনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।





আগের দিনের ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার সহ বাকি সকল কাজ শেষে পরদিন একদম সকালেই সকল শিক্ষার্থী চলে আসে ক্যাম্পাসে। আনুমানিক সকাল নয়টা নাগাদ বিভিন্ন ব্যাচ একত্রিত হয়ে আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এখানে বিশেষ করে ১৭ ব্যাচের পক্ষ থেকে দাবি দেয়া হয় চার্জশীট জমা না হওয়া পর্যন্ত বুয়েটে সকল প্রকার একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। ক্যাম্পাসের সবচেয়ে সিনিওর ব্যাচ, পৌনঃপুনিক ১৫ সবার সাথে কথা বলে দাবিগুলোর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে একটি ৮ দফা দাবি তৈরি করা হয় যা পরবর্তীতে ১০ দফায় রূপান্তর করা হয়।









এর মধ্যে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার ব্যাপারেও জোর দাবি উঠে পৌনঃপুনিক এর পক্ষ থেকে। এবং ক্যাম্পাসের সকল ব্যাচই এতে জোরালোভাবে সমর্থন দেয়। দাবিগুলোকে তাদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সাজানোর জন্য সকল ব্যাচের মতামত নেয়া হয়। ১৬ ব্যাচ সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিকে দ্বিতীয় দাবি হিসাবে তুলে ধরে। তবে ১৭ ব্যাচের সুপারিশে আবরার ফাহাদের হত্যার বিচার সম্পর্কিত সকল দাবিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।





এদিন দুপুরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলতে আসেন ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালক মিজানুর রহমান স্যার। বুয়েট শহিদ মিনারের সামনে বসে তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন। বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে তিনি রাজনৈতিক কারণে মতামত প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করেন। আনুমানিক দেড় ঘন্টার মত উপস্থিত থেকে তিনি অফিসের দিকে যান। 





তার মাধ্যমে বিকাল পাঁচটার মধ্যে উপাচার্য মহোদয়কে শিক্ষার্থীদের সাথে দেখা করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। অন্যথায় ক্যাম্পাস তালাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরমধ্যেই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ ভাবে মিছিল করে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বুয়েটের বেশ কিছু  শিক্ষক মিছিলে অংশ নেন। পাশাপাশি রাস্তা অবরোধের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও দশমীর পূজার কথা চিন্তা করে শিক্ষার্থীরা বুয়েটের সেন্ট্রাল রোডেই অবস্থান নেয়।





এখানে উল্লেখ্য, নির্যাতনের পরে আবরারকে শিবিরকর্মী হিসেবে ধরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে খুনিরা পুলিশ ডেকে আনে। কিন্তু আবরারের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে পুলিশকে হলে ঢুকতে মানা করা হয়। 





এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান যে পুলিশের আসা সম্পর্কে হল কর্তৃপক্ষ জানতেন। পরবর্তীতে হলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় যে হল প্রভোস্ট এবং ছাত্রকল্যাণ পরিচালক দুইজন স্যারই ভোর রাতে উপস্থিত ছিলেন। অথচ তৎক্ষনাৎ কোনো স্পষ্ট ব্যবস্থা সেখানে নেয়া হয় নি বরং পরে ভিডিও ফুটেজ ছাত্রদের হস্তান্তর করা নিয়েও যথেষ্ট গড়িমসি করা হয়। ছাত্রকল্যাণ পরিচালক কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলেও কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায় নি। তদুপরি ৭ অক্টোবর বিকাল থেকে হলে প্রায় শ’দুয়েক দাঙা পুলিশের উপস্থিতি, ছাত্র কল্যাণ পরিচালকের অনুপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায় নি। 





ইতোমধ্যে বেঁধে দেয়া সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিকাল পাঁচটায় ভিসি স্যার দেখা করবেন বলে জানান। সন্ধ্যা নামার প্রাক্কালে তিনি তাঁর কার্যালয়ে এসে উপস্থিত হন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সাথে কথা না বলে তিনি সরাসরি কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এরপর উপস্থিত বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তার কার্যালয় তালাবদ্ধ করে দেয় এবং সামনের রাস্তায় অবস্থান নেয়। এর মাঝে মোমবাতি প্রজ্জ্বলিত করা হয় আবরার ফাহাদ স্মরণে। আনুমানিক রাত নয়টার দিকে ভিসি স্যার শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন তাঁর অফিসের তালা খুলে দেয়া হয় এবং ভিসি স্যার নিচে নেমে আসেন। শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া শুনে তিনি কেবল তাঁর 'নীতিগত সমর্থন' জানান। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ প্রশ্নের তিনি কোন সুস্পষ্ট উত্তর দেন না। তিনি এও বলেন এই মুহূর্তে কোন উত্তর দিবেন না। কোনো সঠিক দিক নির্দেশনা না দিয়ে তিনি কার্যালয়ে ফিরে যান। 





প্রশ্নের সদুত্তর না পেয়ে শিক্ষার্থীরা পুনরায় ভিসি অফিস তালাবদ্ধ করে রাখে। কিছু সময় পর উনাকে একটি আল্টিমেটাম দিয়ে সেদিনের মত শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করে। ক্যাম্পাস ত্যাগের পূর্বে শিক্ষার্থীদের পক্ষ হতে সংবাদ মাধ্যমের সামনে দশ দফা দাবি পেশ করা হয়, যা নিম্নরূপঃ





১. খুনীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সিসিটিভি ফুটেজ ও জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যনুসারে শনাক্তকারি খুনীদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।





২. বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিশ্চিতভাবে খুনী সনাক্তকরণের ৭২ ঘন্টার মধ্যে সনাক্তকৃত খুনীদের সকলের আজীবন বহিঃস্কার নিশ্চিত করতে হবে।





৩. মামলা চলাকালীন সকল খরচ এবং আবরারের পরিবারের সকল ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে। এ মর্মে অফিশিয়াল নোটিশ ১১ তারিখ ৫ টার মধ্যে প্রদান করতে হবে।





৪. দায়েরকৃত মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের অধীনে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি করার জন্য বুয়েট প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বুয়েট প্রশাসনকে সক্রিয় থেকে সমস্ত প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষন করতে হবে এবং নিয়মিত ছাত্রদের আপডেট করতে হবে।





৫. অবিলম্বে চার্জশীটের কপিসহ অফিশিয়াল নোটিশ দিতে হবে।





৬. বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে বুয়েটে হলে হলে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করে রাখা হয়েছে। জুনিয়র মোস্ট ব্যাচকে সবসময় ভয়ভীতি প্রদর্শনপূর্বক জোর করে রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে যুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেকোন সময় যেকোন হল থেকে সাধারন ছাত্রদের জোরপ্রদর্শনপূর্বক হল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলে হলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনের এহেন কর্মকান্ডে সাধারন ছাত্রছাত্রীরা ক্ষুব্ধ, তাই আগামী ৭ দিনের (১৫ অক্টোবর) মধ্যে বুয়েটে সকল রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।





৭. বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘন্টা অতিবাহিত হবার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় নি এবং পরবর্তীতে ৩৮ ঘন্টা পরে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে বিরূপ আচরন করে এবং কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন, তাকে সশরীরে ক্যাম্পাসে এসে আজ(০৯/১০/১৯) দুপুর ২ টার মধ্যে জবাবদিহি করতে হবে।





৮. আবাসিক হলগুলোতে র‍্যাগের নামে এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের উপর সকল প্রকার শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনকে জড়িত সকলের ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। একই সাথে আহসানউল্লা হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোতে জড়িত সকলের ছাত্রত্ব বাতিল ১১ অক্টোবর,২০১৯ তারিখ বিকাল ৫ টার মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে।





৯. পূর্বে ঘটা এধরনের ঘটনা প্রকাশ এবং পরবর্তীতে ঘটা যেকোন ঘটনা প্রকাশের জন্য একটা কমন প্লাটফর্ম(কোন সাইট বা ফর্ম) থাকতে হবে এবং নিয়মিত প্রকাশিত ঘটনা রিভিউ করে দ্রুততম সময়ে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এই প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বুয়েটের বিআইআইএস একাউন্ট ব্যবহার করতে হবে এবং ১১ অক্টোবর, ২০১৯ বিকাল ৫ টার মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শন করতে হবে এবং পরবর্তী ১ মাসের মধ্যে কার্যক্রম পূর্নরূপে শুরু করতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে সবগুলো হলের প্রত্যেক ফ্লোরের সবগুলা উইংয়ের দুইপাশে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে হবে।





১০. রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ অক্টোবর, ২০১৯ তারিখ বিকাল ৫ টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে।