৭ অক্টোবর, ২০১৯ - সকাল

Share this


৭ অক্টোবর সকালে শেরে বাংলা হলের ব্যাচ’১৭ এর ছাত্রদের পোস্ট দেখে বুয়েটের অন্যরাও হত্যাকান্ড সম্পর্কে জানতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সবাই শেরেবাংলা হলে একত্রিত হতে শুরু করে। কারো চোখে ছিল ভাই হারানোর অশ্রু, কেউ হয়তো বা বুঝে উঠার চেষ্টা করছিলো কিভাবে তাদের প্রাণের ক্যাম্পাসে কারো হত্যা হতে পারে। শুধু একদল পাষাণ কে দেখা যায় শান্তভাবে ঘুরে বেড়াতে, একটা খুন করার পরেও কিভাবে এই পশুরা এতো শান্ত থাকতে পারে এবং গর্ব নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে, তা সত্যিই অবাক করার মতো।





উপরের তলার ২০১১ এর বারান্দার দরজা খোলা ছিলো, সেখানে তখন পুলিশের ফরেনসিক বিভাগ আলামত সংগ্রহ করছিলো। পাশাপাশি নিচে তখন পুলিশ ভিডিও ফুটেজ চেক করার জন্য প্রোভোস্ট স্যারের রুমের দিকে এগুতে থাকে। কিন্তু ছাত্রদের মনে শঙ্কা জাগতে থাকে যে এই হত্যা কে অন্যদিকে মোড় দেয়ার একটা চেষ্টা হতে পারে। পাশাপাশি একটা খবর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে যে, আবরারের রুমে মাদকদ্রব্য রেখে হত্যা কে অন্যদিকে মোড় দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই শঙ্কার কারনে ছাত্ররা পুলিশের কাছে আবেদন জানায় যেন ছাত্রদের কয়েকজনকে ভিডিও ফুটেজ কালেক্ট করার সময় সাথে রাখা হয়। পাশাপাশি ভিডিও এর এক কপি যেন ছাত্রদের সরবরাহ করা হয়, সেই দাবিও আসে ছাত্রদের থেকে। শুরুতে ছাত্রদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে নেয়া হবে বলা হলেও পুলিশ এক পর্যায়ে টালবাহানা শুরু করে। প্রথমে বলা হয় ফুটেজ সংগ্রহ অনেক সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, কাজেই শেষ হলে এক কপি দেয়া হবে। কিছু সময় পর আবার বলা হয় মামলার আলামত ছাত্রদের নিকট হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। শুরুতে ১০টা, পরবর্তীতে ১২টায় ছাত্রদের প্রতিনিধি নেওয়া হবে বললেও শেষে দুপুরের কিছু পরে কয়েকজন আসামী শনাক্তকরনের জন্য ছাত্রদের ডেকে নেওয়া হয়। আবরারের একজন আত্মীয়ও শনাক্তকরণের সময় উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদের সাথে।





আবরারের কক্ষে মাদকদ্রব্য রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, এ খবর শোনার পর ছাত্ররা ১০১১ নং রুম পাহারা দিতে শুরু করে। ইতোমধ্যে দুপুরের দিকে যখন ছাত্ররা পুলিশের সাথে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে নেগোসিয়েশনে ব্যস্ত, তখন সবার আগে লক্ষ্য করা যায়, পুলিশ বুয়েট ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারন সম্পাদক মেহেদি হাসান রাসেল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, ব্যাচ ’১৩) কে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। 





পরপরই দেখা যায় খুব ধীরস্থিরভাবে পুলিশ কাউকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। একদম শান্তভাবে সবুজ টি-শার্ট গায়ে, ট্রাউজারের পকেটে হাত দিয়ে হেঁটে গেলো একজন। সবাই তখন ভাবছিলো এমনি জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয়তো নিয়ে যাচ্ছে। আরেকজনকে পুলিশ দৌড়ে নিয়ে গাড়িতে উঠলো। এরপর অন্যজন কালো টি-শার্ট গায়ে হাসতে হাসতে বের হয়ে গেলো। ফটোশুটের জন্যে পোজও দিলো ক্যামেরার সামনে। এরা ছিলো- মুহতাসিম ফুয়াদ (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, ব্যাচ’১৪), অনিক সরকার (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, ব্যাচ’১৫), হাস্যমুখী মিফতাহুল হক জিয়ন (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, ব্যাচ’১৫)। আবরার হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীদের তিনজন। বিকেল বেলাতেই আরো দুই আসামী মুনতাসির আল জেমি (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, ব্যাচ’১৭) এবং তানভীর খন্দকার (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, ব্যাচ’১৬) কেও পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।





ডিএসডব্লিউ স্যার বেলা ১১টার দিকে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে হলে আসেন। এরপর শিক্ষার্থীরা সিসিটিভি ফুটেজ পাবার ব্যাপারে স্যারের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি সরাসরি প্রোভোস্ট স্যারের রুমে চলে যান। সেখানে ঘন্টাখানেক অবস্থান করে কথা না বলেই হল থেকে চলে যান। ডিএসডব্লিউ এর ভাষ্যমতে তিনি মিডিয়া এড়াতে স্থান ত্যাগ করেন। কিছুক্ষণ পর প্রভোস্ট স্যার হল ত্যাগের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা তাকে ঘিরে ধরে। তার কাছে ফুটেজ চাওয়ার ব্যাপারে সহায়তা চাওয়া হয়। স্যার জানান এটি পুলিশের হাতে ন্যস্ত। পরবর্তীতে স্যারকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে এই ব্যাপারে ভিসি স্যার কোন সহায়তা করতে পারবেন কি না এবং ভিসি স্যার হলে আসবেন কি না। এর উত্তরে স্যার জানান উনিও সকাল থেকে ভিসি স্যারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। এরপর তিনি শিক্ষার্থীদের সামনেই ভিসি স্যারকে কল দেন, কিন্তু তাকে পাওয়া যায় নি। হলে অন্য কোন শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রভোস্ট স্যারকে অনুরোধ করে হলে অবস্থানের জন্য। স্যার অনুরোধ শুনে পুনরায় তার রুমে ফিরে যান। 





এদিকে ফুটেজ দেয়ার ব্যাপারে পুলিশের টালবাহানা চলতে থাকে। একবার বেলা ১১ টায়, একবার আড়াইটায়, একবার চারটায় নানাভাবে তারা বিভিন্ন সময়ে ফুটেজ দিবেন, বা সবাইকে দিবেন না, কিছু প্রতিনিধিকে শুধু দেখাবেন এসব বলে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে বলা হয় সম্পূর্ণ ফুটেজের পরিবর্তে ফুটেজের খন্ডিত অংশ দেয়া হবে। এতে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরো পুঞ্জিভূত হতে থাকে। পাশাপাশি তাদের মনে এই ভয় আরো ঘনীভূত হতে থাকে যে, হয়তো আসল ভিডিও ফুটেজ সত্যিই বিকৃত করা হবে।





৭ই অক্টোবর বিকাল শেষে ছাত্রদের মনে একদিকে যেমন হত্যাকে ধাপাচাপা দেয়ার ভয় কাজ করতে থাকে, তেমনি কয়েকজন হত্যাকারীকে গ্রেফতারের কারনে সেই ভয়ের মাঝেও কিছুটা আশার আলোও দেখতে থাকে শিক্ষার্থীরা।