৬ অক্টোবর, ২০১৯

Share this


দিবাগত রাত প্রায় ৩ টা





"দোস্ত, এই দোস্ত, উঠ, উঠ তাড়াতাড়ি"





বন্ধুর ভয়ার্ত কন্ঠের ডাক শুনে আমার কাচা ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। মাত্রই ঘুমিয়েছি, তাই একটু বিরক্তির সুরে বললাম-





"কি হইছে?"
"আবরারকে মেরে ফেলছে"
"ধুর! কি যে কস না, ঘুমাইতে দে"
"সত্যি বলতেছি, উঠে দেখ বারান্দায় রাখছে"





আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারতেছি না, তখনও ঘুমের ঘোরে আছি। মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে পড়লাম, নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। শেরে বাংলা হলে থাকা বেশিরভাগ ছাত্রেরই সে রাতে একইভাবে ঘুম ভাঙ্গে।





পিএল চলায় অনেকে হয়তো রাত জেগে পড়াশুনায় ব্যস্ত ছিলো, বাকিরা ছিল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, শুধু একদল হায়েনা বাদে যারা বুয়েটের গায়ে সবচেয়ে কলঙ্কিত রাতটি অঙ্কিত করতে ব্যস্ত ছিলো। নিচ তলায় আবরারের বন্ধুরা প্রথম জানতে পারে আবরারের মৃত্যুর ব্যাপারে। যখন আবরারের রুমমেট প্রথম আবরার কে দেখতে যায়, তখন আবরার প্রথম এবং ২য় তলার মাঝের ল্যান্ডিং এর উপর একটা নোংরা তোষক এর উপর পড়ে ছিল এবং বুয়েট মেডিকেলের দায়িত্বরত চিকিৎসক আবরারের পালস চেক করছিলেন। কয়েক মুহূর্ত পরেই ডাক্তার যখন বলে, আবরার আর বেচে নেই, তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যেতে থাকে, সবাই যেন তখন চোখে অন্ধকার দেখছিলো। ডাক্তারের পাশে ওখানে ছিল বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক মেহেদি হাসান রাসেল। সে ডাক্তারকে এটাই বুঝানর ট্রাই করছিলো যে এটা কিভাবে হতে পারে। ফাহাদ তো ৫ মিনিট আগেও নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। সে ডাক্তারকে প্রেশার দেয় যাতে আবরারকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। কিন্তু ডাক্তার সাহেব তখন বলছিলেন যে পুলিশ না আসা পর্যন্ত ফাহাদের লাশ সে কোথাও নিতে দিবেন না। উনার দৃঢ় মনোভাবের জন্য রাসেলদের প্রাথমিক ধামাচাপা দেয়ার প্ল্যান সেখানেই ভেস্তে যায়।





তারপর আবরারের লাশ কে নিচ তলায় নামানো হয়। এদিকে আবরারের মৃত্যুর খবর জানার পর ২/৩ জন লাশের দিকে জড়ো হতে শুরু করে। তখন তারা দেখতে পায় চারদিকে দাড়িয়ে আছে অনিক(মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ’১৫ ব্যাচ), জিসান(ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ‘১৬ ব্যাচ), সকাল(বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ‘১৬ ব্যাচ) আর সেতু(কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ’১৪ ব্যাচ)। আবরারের বন্ধুদের জড়ো হতে দেখে তারা নির্দেশ দেয়, “রুমে যাহ, আমরা আছি এখানে”।





এই মানুষবেশী হায়ানাদের পূর্ব তাণ্ডবের স্মৃতির কারনে আবরারের বন্ধুরা ওখানে থাকার মতো সাহস পাচ্ছিলো না, তাই তারা তাদের রুমে চলে গিয়ে সেখান থেকেই হত্যাকারিদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে ব্যাপারটা সবাইকে জানাতে হবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারে যে এই অল্প কয়জন মিলে কিছু করলে এবং পরে হত্যাকারিরা বেচে গেলে এই কয়জনেরও হয়তো আবরারের মতো পরিনতি বহন করতে হবে। তাই এই কয়জন মিলে ‘১৭ ব্যাচের যারা যারা হলে ছিল তাদের রুমে রুমে গিয়ে, ফোন করে, মেসেজ দিয়ে ১০১০ নাম্বার রুমে ডেকে আনে। মোটামুটি ১০-১৫ জন ছেলে আসার পর রুমের দরজা আটকে দিয়ে ফেসবুকে দেয়ার জন্য পোস্ট লেখা হয়। তানভির, সিজভি, সোহান, ফারহান আরো কয়েকজন মিলে অনেক সতর্কতার সাথে পোস্ট লিখেছিল যেন পরবর্তিতে পোস্টের লেখার জন্য ছাত্রদেরকে আবার না মারে। কেউ একা পোস্ট দিলে যদি আবার তাকে ধরে মারে সেই ভয়ে প্ল্যান করা হয় সবাই একসাথে কারেন্ট স্টুডেন্টস অব বুয়েট, বুয়েটে আড়িপেতে শোনা, শেরে বাংলা হলের গ্রুপ আর নিজের ওয়ালে পোস্ট করবে, মারলে সবাইকে মারতে হবে, সবাই একসাথেই মার খাবে দরকার হলে। রীতিমতো কাউন্টডাউন করে ’১৭ ব্যাচের কয়েকজন পোস্ট দেয় সে রাতে(ওইদিন সকালবেলাই ইসতিয়াক মুন্না অথবা রবিন নাকি জিজ্ঞেস করেছিল যে কে আগে পোস্ট দিয়েছে, পোস্ট ডিলিট করে ফেল)।





ততক্ষণে ডিএসডব্লিউ স্যার, প্রভোস্ট স্যার সবাই হলে চলে আসে। ছাত্ররা গিয়ে দেখে উনারা রাসেল (জিএস) এর সাথে কথা বলতেছে। ছাত্ররা সহকারী প্রভোস্ট স্যারের (ইফতেখার স্যার) কাছে গেলে উনি ডিএসডব্লিউ স্যারের সাথে কথা বলতে বলেন।তখন ছাত্ররা স্যারকে ডেকে ১০১১ নাম্বার রুমে নিয়ে যায় কথা বলার জন্য। ইফতেখার স্যার রুমে সবাইকে ঢুকানোর পর দরজা আটকিয়ে দেয় যাতে আর কেউ আসতে না পারে। কিন্তু ছাত্রদের কথা শেষ না হতেই রাসেল আর অনিক, ইফতেখার স্যারের বাধা দেওয়া সত্ত্বেও জানালা দিয়ে দরজা খুলে জোরপূর্বক রুমে এসে ডিএসডব্লিউ স্যারকে বলেন যে পুলিশ আসছে, লাশ নিয়ে যাবে, কাগজে সাক্ষর করতে হবে আর তাদের সাথে কথা বলতে হবে, আপনি আসেন। ইফতেখার স্যার ওদেরকে পরে আসতে বলে, ছাত্রদের সাথে কথা শেষ হলে তারপর স্যার যাবে বলে জানায়। কিন্তু ডিএসডব্লিউ স্যার ছাত্রদের সাথে কথা শেষ না করেই পরে কথা বলবেন বলে চলে যান। এদিকে ছাত্ররা সবাই ১০১০ এর সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিলো আর যতজনকে পারা যায় জানাচ্ছিলো।





এইসময় ‘১৭ ব্যাচেরই ত্বোহা, বিল্লাহ, মোয়াজ আর মোর্শেদ এসে তারা আবরারকে বাচাতে কি কি করছে সেগুলা বলে, নিজেদেরকে জাস্টিফাই করার ট্রাই করে। একপর্যায়ে সাধারনত ছাত্রদের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পেরে চলে যায় ওরা। ইতোমধ্যেই ছাত্ররা জানতে পারে যে আবরারের মৃতদেহ গুম করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই ছাত্রদের একজন গিয়ে লুকিয়ে আবরারের কিছু ছবি তুলে কয়েকজনকে অনলাইনে পাঠিয়ে দেয়। এরপর ’১৭ ব্যাচের কয়েকজন মিজানের (আবরারের রুমমেট) সাথে কথা বলতে যায়, উনি কান্না করতেছিলেন কিন্তু ছাত্রদেরকে তার ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে কিছুই জানায় না (তখনো সবাই তাকে নির্দোষ ভাবছিলো)। একসময় আবরারের লাশ হলের গেট থেকে ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া হয় আর ছাত্রদেরকে সেখানে যেতে মানা করে প্রশাসন। তাই ছাত্ররা তখন ১০১০ এ বসে কি করা যায় সেগুলা নিয়ে কথা বলতে থাকে। এসময় সাখাওয়াত অভি, মহিউদ্দিন, ফুয়াদসহ আরো কয়েকজন কেদেই যাচ্ছিলো। ওদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টাও করছিলো কয়েকজন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা আর অবস্থা একজনেরও ছিল না। সবাই ভীত আর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ছিল।





ফেসবুকের পোস্ট দেখে, অনেকে ফোন পেয়ে অথবা অন্যকোনোভাবে সাড়া পেয়ে সকালের দিকে অন্যান্য হল থেকে ধীরে ধীরে সবাই আসা শুরু করে। কিছু পত্রিকাও চলে আসে ততক্ষণে। তখনও হত্যাকান্ডে জড়িত প্রায় সকলেই হলেই ছিল, হয়তো ভেবেছিল তাদের আবার কে ধরবে অথবা তারা হয়তো কোন অপরাধই করে নাই, নাহলে একটা মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার পরও কেউ অতটা শান্ত থাকে কিভাবে? সকাল হয়ে গেছে, পুলিশের কাছে লাশ হস্তান্তর করার সকল প্রশাসনিক কাজও শেষ। আরাফাত আর কে কে যেন পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিচ্ছিল আর বাকিরা ক্যান্টিনের আশেপাশেই দাড়িয়ে আছে। হঠাৎ স্ট্রেচারের কচকচ শব্দে সকলের মনোযোগ ক্যান্টিনের দরজার দিকে ঘুরে গেল। দরজা দিয়ে বের করা হচ্ছে আবরারের লাশ (আসলে তো বুয়েটের লাশ)। ছাত্ররা সবাই স্ট্রেচারের পিছে পিছে জিমনেসিয়াম পর্যন্ত যায়, লাশ পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়, পুলিশের সাথে হল থেকে কে যাবে সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনার পরে প্রভোস্ট স্যার যায়। পুলিশের গাড়ি আস্তে আস্তে চলতে শুরু করে আর সবাই করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে গাড়ির দিকে। গাড়ি চলে যাওয়ার পরই শুনতে পাওয়া যায় পুলিশ নাকি ফুয়াদকে (লীগের) ধরে নিয়ে গেছে।





আর এভাবেই বুয়েটের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত রাতের অবসান হয়।