৬ অক্টোবর, ২০১৯

Share this


তখন রাত প্রায় ৩টা। পিএল (PL- Preparatory Leave) চলছে। কেউ কেউ পিএলে নিজের টার্ম ফাইনালের প্রিপারেশন শক্ত করছিলো, কেউ কেউ আবার মধ্যরাতে প্রগাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন, শুধু একদল হায়েনা বুয়েটের গায়ে সবচেয়ে কলঙ্কিত রাতটি অংকন করতে ব্যস্ত ছিলো। তখনো কেউ জানত না, রাতের নিস্তব্ধতার মতো তাদেরই কাছের একটা প্রাণও নিস্তব্ধতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।





পিএলে বুয়েটের ছেলেরা সারারাত জেগে পড়ে, আর সারারাত জেগে পড়ার জন্য মাঝরাতে অনেকেই খাওয়াদাওয়া করতে বের হয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আবরারের কিছু বন্ধু তখন হল থেকে বের হওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। ঠিক তখনই তারা প্রথম এবং দ্বিতীয় তলার ল্যান্ডিংয়ের মাঝে আবরারের নিথর দেহটা পড়ে থাকতে দেখে। বুয়েটে নিজের হলকে যেখানে সবাই দ্বিতীয় বাড়ি হিসেবে জানে, সেখানে বন্ধুর লাশ দেখে আবরারের বন্ধুরা তখন হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু নিজেদের আবেগকে সামলে রেখে তখন তারা নিচের তলার '১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের, আবরারের বন্ধুদেরকে, আবরারের মৃত্যু এবং ল্যান্ডিংয়ে আবরারের লাশ পড়ে থাকার ব্যাপারে জানাতে থাকে। খবর পেয়ে নিচতলার কয়েকজন আবরারের লাশের কাছে যায়। ততক্ষণে সেখানে বুয়েট মেডিকেলের ডাক্তার এসে আবরারের পালস চেক করছিলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো তৎকালীন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল। পালস চেক করে ডাক্তার জানান যে, আবরার আর বেঁচে নেই। তখন রাসেল ডাক্তারকে প্রেশার দিতে শুরু করে যাতে আবরারকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। রাসেল এবং এই হত্যায় জড়িতদের উদ্দেশ্যই ছিলো, আবরারের লাশকে কোনভাবে হল থেকে বের করা। তাহলেই এই হত্যাকে অন্যদিকে প্রবাহিত করা সহজ হবে। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যে পানি ঢেলে দিয়ে ডাক্তার সাহেব জানান পুলিশ না আসা পর্যন্ত তিনি আবরারের লাশকে কোথাও নিতে দিবেন না। উনার দৃঢ় মনোভাবের জন্যেই খুনীদের প্রাথমিক ধামাচাপা দেয়ার পরিকল্পনা অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়।





এরপর আবরারের লাশকে ল্যান্ডিং থেকে নিচতলায় নামানো হয়। তখন '১৭ ব্যাচের আবরারের বন্ধুরা লাশের চারপাশে জড়ো হতে শুরু করে। সেখানে আবরারের বন্ধুরা ছাড়াও দাঁড়িয়ে ছিলো অনিক(মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ’১৫ ব্যাচ), জিসান(ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ‘১৬ ব্যাচ), সকাল(বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ‘১৬ ব্যাচ) আর সেতু(কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ’১৪ ব্যাচ)। প্রসঙ্গত, এরাও আবরার হত্যার সাথে জড়িত ছিলো। উক্ত কুলাঙ্গারেরা আবরারের বন্ধুদের জড়ো হতে দেখে তৎক্ষনাৎ ওদেরকে নিজেদের রুমে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।





এই মানুষবেশী হায়েনাদের পূর্ব তাণ্ডবের স্মৃতির কারনে আবরারের বন্ধুরা সেখানে থাকার মতো সাহস পাচ্ছিলো না, তাই তারা তাদের রুমে চলে গিয়ে সেখান থেকেই হত্যাকারিদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে এবং সবাইকে আবরার হত্যার ব্যাপারে জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু, তাদের মনে এই ভয়ও কাজ করছিলো যে, যদি গুটিকয়েক জন মিলে কিছু করে এবং পরবর্তীতে হত্যাকারীরা বেঁচে যায়, তবে তাদেরকেও আবরারের মতো পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। তাই তারা প্রথমত, হলে উপস্থিত  '১৭ ব্যাচের সকল বন্ধুদের, ম্যাসেজ দিয়ে, কল করে ১০১০ নম্বর রুমে ডেকে আনে। তারপর সেখানে সেই রুমে দাঁড়িয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা সকলে মিলে একটি পোস্ট লিখবে এবং একইসাথে সবাই মিলে তাদের ব্যাচগ্রুপ, কারেন্ট স্টুডেন্টস অব বুয়েট, বুয়েটে আড়িপেতে শোনা গ্রুপ এবং নিজেদের টাইমলাইনে পোস্টটি দিবে। যদি শুধু একজন পোস্ট দেয়, তবে পরবর্তীতে হত্যাকারীরা বেঁচে গেলে তাকে মারাত্মক পরিণতি বহন করতে হতে পারে এই আশঙ্কায় এরূপ সিদ্ধান্ত নেয় '১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। '১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ভেবে নেয়, পোস্ট দেয়ার জন্য অত্যাচার সহ্য করতে হলে সবাই মিলে একইসাথে করবে, শুধু ব্যক্তিবিশেষের উপর অত্যাচার আসতে দিবেনা। রীতিমতো কাউন্টডাউন করে সে রাতে নিচের পোস্টটি দেয় '১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা-





“আমাদের ১৭ ব্যাচের EEE dept এর আবরার ফাহাদ(শের এ বাংলা হল) (১৭০৬০৯৮)আর নেই।





গতকাল (০৬-১০-১৭) রাত ৭-৮ টায় তাকে রুম থেকে হলের (শেরে বাংলা হল)কয়েকজন ডেকে নিয়ে যায়। এর মাঝে ওকে আর রাত দুটার আগ পর্যন্ত কোথাও দেখা যায় নাই। কজন আনুমানিক রাত দুইটায় হল এর সিড়ির কাছে ওর লাশ পরে থাকতে দেখে। ওর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।





ছেলেটি রাত ৭-৮ টায় সুস্থ অবস্থায় রুম থেকে গিয়ে রাত ২ টায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গেলো যেটা মোটেই স্বাভাবিক না।





এর মাঝে কি এমন হলো ওটাই আমরা জানতে চাই।”





পরবর্তীতে জানা যায় ৭ই অক্টোবর সকালে, খুনী মুন্না, তার সহচরদের জিজ্ঞাসা করেছিল '১৭ ব্যাচের কে সবার আগে পোস্ট করেছিলো। অর্থাৎ, '১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সন্দেহ যে সত্যি ছিলো, তা-ই প্রমাণিত হয়। 





ততক্ষণে ডিএসডব্লিউ স্যার, প্রভোস্ট স্যার এবং এসিস্ট্যান্ট প্রভোস্ট স্যার শেরে বাংলা হলে চলে আসেন। ছাত্ররা তখন ডিএসডব্লিউ স্যার এবং এসিস্ট্যান্ট প্রভোস্ট ইফতেখার স্যারের সাথে আলাদাভাবে কথা বলার অনুরোধ করে। ছাত্রদের অনুরোধ সাপেক্ষে, তারা শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে ১০১১ নম্বর রুমে চলে যান এবং ইফতেখার স্যার দরজা বন্ধ করে দেন যাতে শিক্ষার্থীদের কথা তারা ঠিকমতো শুনতে পারেন। কিন্তু ছাত্রদের কথা শেষ হওয়ার আগেই রাসেল এবং অনিক সেখানে চলে আসে এবং ইফতেখার স্যারের বাধা দেয়া সত্ত্বেও জানালা দিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে তারা রুমে প্রবেশ করেন। রাসেল এবং অনিক এসে জানায় যে, আবরারের লাশ নেয়ার জন্য হলে ইতোমধ্যে পুলিশ চলে এসেছে। কিছু ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করার জন্য এবং পুলিশের সাথে কথা বলার জন্য ডিএসডব্লিউ স্যারকে তৎক্ষনাৎ তারা রুম থেকে বের হওয়ার জন্য প্রেশার দিতে শুরু করে। এসিস্ট্যান্ট প্রভোস্ট স্যার নিজের স্ট্যান্ডে শক্ত থাকেন যে, ছাত্রদের সাথে কথা শেষ হওয়ার আগে তারা যাবেন না। কিন্তু ডিএসডব্লিউ স্যার তখনই ছাত্রদের সাথে কথা শেষ না করেই পুলিশের সাথে কথা বলার জন্য রুম থেকে বের হয়ে যান।





ইতিমধ্যে, '১৭ ব্যাচের যারা খুনের সাথে জড়িত ছিলো, তারা '১৭ ব্যাচের বাকিদের কাছে আবরারকে বাঁচাতে তারা কী কী করেছে সেটা জানিয়ে নিজেদের জাস্টিফাই করতে শুরু করে। কিন্তু ছাত্রদের নানাবিধ যৌক্তিক প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে না পেরে তারা স্থানত্যাগ করে। এমনকি, শিক্ষার্থীরা আবরারের রুমমেট মিজানের সাথেও কথা বলে এবং তার কাছে ঘটনার কিছুটা বিবরণ আশা করে(শিক্ষার্থীরা তখনো জানতো না, মিজানও হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলো)। এরপর আবরারের ২/১ জন বন্ধু লাশের কাছে গিয়ে, লুকিয়ে, লাশের কিছু ছবি তুলে আনে এবং অনলাইনে ছবিগুলো দিয়ে দেয়। আবরারের উপর যে অমানবিক অত্যাচার হয়েছে, এটা প্রকাশ করার জন্যেই এমন পদক্ষেপ নেয় শিক্ষার্থীরা। তখন আবরারের লাশকে নিচের করিডোর থেকে ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে রাখা হয়।





ইতিমধ্যে, ফেসবুকের পোস্ট দেখে, কারো কল পেয়ে অথবা অন্য কোনো ভাবে সাড়া পেয়ে সকালের দিকে অন্য হল থেকেও শিক্ষার্থীরা এসে শেরে বাংলা হলে জড়ো হতে শুরু করে। তাছাড়া, কিছু সংবাদপত্রও ততক্ষণে হলে চলে আসে। যারা যারা হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলো, তারা তখনো হলে ছিলো, নিশ্চিন্তভাবে ঘুরছিলো, হয়তোবা তারা ভেবেছিলো যে, কোনোভাবে হত্যাকান্ডের পুরো ব্যাপারটা তারা ধামাচাপা দিয়ে ফেলবে। নতুবা একটা মানুষকে হত্যা করার পরেও এতো শান্ত কিভাবে থাকা যায়? 





ততক্ষণে পুলিশের কাছে লাশ হস্তান্তর করার প্রশাসনিক কাজও শেষ। হঠাৎ স্ট্রেচারের কচকচ শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। ক্যান্টিনের দরজা দিয়ে বের হচ্ছে আবরারের লাশ। সবাই স্ট্রেচারের পিছু নেয়। জিমনেসিয়ামের সামনে রাখা পুলিশের গাড়িতে তারপর আবরারের লাশকে উঠানো হয়। হলে থেকে প্রভোস্ট স্যার আবরারের লাশের সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পুলিশের গাড়ি আস্তে আস্তে চলতে শুরু করে আর সবাই করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে গাড়ির দিকে।





সবাই তখনো মারাত্মক দোলাচলে ছিলো, আদৌ তাদের ভাইয়ের হত্যাকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারবে তো?





এমন হাজারো প্রশ্নের মাঝেই অবসান হয় বুয়েটের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত রাতের।