১২ অক্টোবর, ২০১৯

Share this


১১ অক্টোবর, ২০১৯ ইং তারিখে বুয়েটের তৎকালীন ভিসি ড. সাইফুল ইসলাম সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনায় বসেন। সেই আলোচনা সভায় বুয়েটে সকল প্রকার সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা আসে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থান জানিয়ে দেন ১১ তারিখ রাতেই। তবে সামান্য ভুল বোঝাবুঝির জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবস্থান মিডিয়াতে ভুলভাবে উপস্থাপিত হয় এবং সেই ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে ১২ অক্টোবর পুনরায় প্রেস ব্রিফিং করা হয়। 





১২ অক্টোবর সকাল থেকে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও বিভিন্ন ব্যাচের নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলে। এবং সকল আলোচনা শেষে সব পারিপার্শ্বিকতা চিন্তা করেই দুপুর প্রায় ২:১৫ টার দিকে প্রেস ব্রিফিং করা হয়। এসময়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানানো হয় যে, আন্দোলন যেই দশটি দফা নিয়ে, সেই দশটি দফার প্রতিটির দৃশ্যমান প্রয়োগ না দেখা পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না। যদিও প্রশাসন ইতিমধ্যে আশ্বাস দিয়েছেন যে প্রতিটি দাবি গুরুত্বসহকারে মেনে নেয়া হবে, তারপরও যেহেতু অতীতে প্রশাসন একই রকম আশ্বাস দেয়ার পরেও শিক্ষার্থীদের কোনো দাবিরই প্রকৃতপক্ষে প্রয়োগ করেননি, তাই শুধুমাত্র তাদের আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান অগ্রগতির পরেই শিক্ষার্থীরা মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন ছাড়বে। এবং যেহেতু ১৪ অক্টোবরের ভর্তি পরীক্ষা আসন্ন, তাই ভর্তি পরীক্ষার পূর্বেই বুয়েট ক্যাম্পাসে সকল শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেহেতু দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ১২,০০০ শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবার বুয়েট ক্যাম্পাসে আসবেন ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য, তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের খাতিরেই প্রশাসনের কাছে পাঁচটি দাবি তুলে দেয়া হয় যেগুলো মেনে নিলে ১৪ অক্টোবর ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার মত পরিবেশ রয়েছে বলে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মেনে নেয়া হবে। এই পাঁচটি দাবি নতুন কোন দাবি ছিল না, বরং আগের দশটি দাবির মধ্যেই যেগুলো প্রশাসনের পক্ষে তৎক্ষণাৎ প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল, সেগুলোরই দৃশ্যমান অগ্রগতি। দাবিগুলো ছিল নিম্নরূপঃ





১। আবরার ফাহাদের হত্যামামলায় জড়িত সকল আসামীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করতে হবে এবং পরবর্তীতে মামলার চার্জশিট গঠিত হলে চার্জশিট অনুযায়ী অভিযুক্ত সকলকে অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে, এ মর্মে নোটিশ দিতে হবে।





২। আবরার ফাহাদের হত্যাকান্ডের মামলা চলাকালীন সকল খরচ বুয়েট প্রশাসন বহন করবে এবং আবরারের পরিবারকে বুয়েট প্রশাসন থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্ষতিপূরন দিতে হবে; এই মর্মে নোটিশ দিতে হবে।





৩। বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল ধরণের সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধের নোটিশ দিতে হবে এবং পরবর্তীতে কোনো শিক্ষার্থী সাংগঠনিক রাজনীতিতে অংশ নিলে অথবা কোনোরূপ শিক্ষার্থী নির্যাতনে সংযুক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেলে সেক্ষেত্রে কিরূপ শাস্তি হবে তার বিধান নিয়ে নোটিশ দিতে হবে। পরবর্তীতে এই শাস্তির বিধান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্সে সংযুক্ত করা হবে এটিও নোটিশে উল্লেখ করতে হবে।





একইসাথে, বুয়েটের হলগুলোতে যেসব ছাত্র অবৈধভাবে সিট দখল করে আছে তাদেরকে হলগুলো থেকে উৎখাত করতে হবে, যেসব ছাত্রসংগঠনগুলোর অফিস বিভিন্ন হলে রয়েছে সেসব অফিস সিলগালা করতে হবে। 





৪। বুয়েটের অভ্যন্তরীণ BIIS একাউন্টে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ প্রদানের জন্য একটা সাধারন প্ল্যাটফর্ম যোগ করতে হবে এবং এই প্ল্যাটফর্মের নিয়মিত তদারকির জন্য কমিটি গঠন করতে হবে। প্ল্যাটফর্ম যোগ করা এবং কমিটি গঠন করা নিয়ে অবিলম্বে নোটিশ দিতে হবে। 





৫। সকল হলের সকল ফ্লোরের প্রতিটি উইং এর দুইপাশেই সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাতে হবে এবং ক্যামেরার ফুটেজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে প্রশাসনিক নোটিশ দিতে হবে। 





শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিং এ জানানো হয় যে দশদফা দাবির ভিত্তিতে যে আন্দোলন তা চলবেই, কিন্তু যেহেতু ১৪ অক্টোবরের ভর্তি পরীক্ষাইয় দেশের প্রায় ১২,০০০ শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা চরম ভোগান্তির সম্মুখীন হতে পারে, তাই এই পাঁচটি দাবি মেনে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হলে বুয়েট ক্যাম্পাসে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার মত পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে। এবং সেক্ষেত্রে ১৪ অক্টোবর ভর্তি পরীক্ষা নিতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ সহযোগীতা করা হবে। 





প্রকৃতপক্ষে এই পাঁচটি দাবি ১১ অক্টোবর রাতেই প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয় যার প্রেক্ষিতে প্রশাসন পদক্ষেপ নেয়া শুরু করে। এর ভিত্তিতে ১১ অক্টোবর রাতেই প্রশাসন পাঁচটি আলাদা আলাদা খসড়া নোটিশের মাধ্যমে তাদের পাঁচটি দাবি মেনে নেয়ার অবস্থান জানায়। এরপর ১২ অক্টোবর সকাল থেকেই বুয়েটের হলগুলো থেকে অবৈধ শিক্ষার্থীদের উচ্ছেদ করা এবং সাংগঠনিক রাজনীতির অফিসগুলো সিলগালা করার কাজ শুরু করা হয়। এইদিনই বুয়েটের আহসানুল্লাহ হলে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জামিউস সানি এর রুম সিলগালা করা হয়। একইসাথে তিতুমীর হল এবং আহসানুল্লাহ হলে নতুন সিসিটিভি নিয়ে এসে লাগানোর কাজ শুরু করা হয় এবং যেসব সিসিটিভি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট সেসব রিপ্লেস করার কাজও শুরু করা হয়। বুয়েটের BIIS একাউন্টে অভিযোগ দেয়ার প্ল্যাটফর্মটি যোগ করা একটা সময়সাধ্য কাজ হওয়ায় তা তৎক্ষণাৎ করা সম্ভব না হলেও প্রশাসন থেকে নোটিশ দেয়া হয় এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। যেহেতু ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের দেয়া পাঁচটি দাবির প্রতিটি মেনে নেয়া হয় এবং প্রতিটি দাবির ক্ষেত্রে অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়, তাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রেস ব্রিফিং এ ১৩ এবং ১৪ অক্টোবর, দুইদিনের জন্য মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দেন। একইসাথে তারা ঘোষণা দেন যে ১৪ অক্টোবর তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভর্তি পরীক্ষাকে সুষ্ঠ ভাবে হওয়ার জন্য তারা সর্বোচ্চ সহযোগীতা করবেন। শিক্ষার্থীরা আরও জানিয়ে দেন যে দুইদিনের জন্য আন্দোলন শিথিল হলেও তা শেষ নয়। ভর্তি পরীক্ষার পরে এই দুইদিনের পরিস্থিতির উপর বিবেচনা করে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচী জানানো হবে বলে জানিয়ে দেয়া হয়।