১১ অক্টোবর, ২০১৯

Share this


৮ অক্টোবর, ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া বুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অন্যতম মূখ্য একটি দাবি ছিল উপাচার্যকে ঘটনাস্থলে (শেরে বাংলা হল) ৩০ ঘন্টা পরেও উপস্থিত না হওয়া এবং বুয়েট কেন্দ্রীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত আবরার ফাহাদের জানাজায় উপস্থিত না হওয়ার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। ৯ অক্টোবর শিক্ষার্থীদের সাথে দেখা করলেও তিনি যথাযথ উত্তর না দিয়েই স্থান ত্যাগ করেন। এরপর ১১ অক্টোবর বিকেল ৫ টায় বুয়েট অডিটরিয়ামে শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী সকল শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে এবং মিডিয়ার উপস্থিতিতে তিনি আলোচনায় বসতে রাজি হন, তবে তাঁর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব শিক্ষার্থীদেরকে নিতে হবে। এজন্য আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়ঃ





- অডিটোরিয়াম এর ভিতরে শুধুমাত্র চলমান ব্যাচের শিক্ষার্থীরা (১৫, ১৬, ১৭, ১৮) ভিসি স্যারের সাথে কথা বলবেন। কোনো এলাম্নাই বা বহিরাগতরা ভিতরে আসতে পারবেন না। 
- সবাইকে আইডি কার্ড সাথে রাখার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়াও অপরিচিত কেউ যেন না আসে সেজন্য অডিটোরিয়ামের মুখে ৪ টি টেবিলে ৩-৪জন করে প্রতি ব্যাচ থেকে শিক্ষার্থী রাখা হবে যারা পরিচয় নিশ্চিত ও চেকিং করে শিক্ষার্থীদের অডিটোরিয়ামে ঢুকতে দিবে। সাড়ে তিনটা থেকে এই চেকিং বিষয়ক প্রসেস শুরু করতে হবে।
- সংবাদ মাধ্যমগুলোকে আলাদা গেট দিয়ে ঢোকানো হবে। শুধুমাত্র জাতীয় পর্যায়ের পত্রিকা, টিভি চ্যানেল কর্মী ছাড়া অন্য কেউ ভিতরে থাকতে পারবেন না।
- সাংবাদিকদের জন্য বিকাল ৪ টা থেকে অডিটোরিয়ামে প্রবেশের সময় "টেম্পোরারি প্রেস পাশ" দেয়া হবে।
- কোনো টিভি চ্যানেল লাইভ টেলিকাস্টে যাবেনা। এটি তাদের অফিসে আগেই কনফার্ম করতে হবে। এ ব্যাপারে পূর্বেই তাদের অবহিত করা হবে। তাছাড়া তারা কোনো ধরনের প্রশ্ন করতে পারবেন না। এটা ভিসি স্যার ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। তারা শুধুমাত্র উপস্থিত থাকবেন।
- অডিটোরিয়ামের গেট খোলার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা অবস্থান করবে এবং পরবর্তীতে কোনো বহিরাগতদেরকে ভিতরে পাওয়া গেলে তাদের সম্মানের সহিত বাইরে নিয়ে আসা হবে।
- কথা বলার যথোপযুক্ত পরিবেশ থাকবে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হবে।





সর্বোপরি ভিসি স্যারের যেন কোন অসুবিধা যাতে না হয় সে ব্যাপারে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।





১১ অক্টোবর সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকে। শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে একটা সেল গঠন করা হয়, যারা ভিসিকে প্রশ্ন করবে। সকাল ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও প্রস্তাব তৈরি করা হয়। দুপুরের পর থেকে শিক্ষার্থী ও মিডিয়া সমাগম বাড়তে থাকে। এর আগেই বুয়েট ক্যাম্পাসের মেইন গেটের দুইপাশের পকেট গেট বাদে প্রতিটি গেট বন্ধ করে তালা দিয়ে দেয়া হয়। মেইন গেটের দুইপাশের পকেট গেট গুলো দিয়ে বিকাল ৩:৩০ থেকে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করতে শুরু করে। এসময় প্রাথমিকভাবে তাদের আইডি চেক করে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। 





বুয়েট অডিটরিয়ামের সামনে দ্বিতীয় স্তরের নিরাপত্তা হিসেবে বিভিন্ন টেবিলে শিক্ষার্থীদের আদ্যোপান্ত চেক করা হয়। একইসাথে মিডিয়া ও প্রেসের জন্য সম্পূর্ণ একটি আলাদা গেট রাখা হয়, যেখানে চেক করার পর তাদের আলাদা একটি পাস দিয়ে দেয়া হয়। তৃতীয় স্তরের চেকিং হিসেবে অডিটরিয়ামে প্রবেশের সময় আবারও আইডি কার্ড এবং মিডিয়ার ক্ষেত্রে মিডিয়া পাস চেক করা হয়। অডিটরিয়ামের পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় বাইরে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অবস্থান নেয়। তাদের জন্য সাউন্ড বক্সের সাহায্যে ভেতরের কথোপকথন বাইরে শোনার ব্যবস্থা করা হয়। সবশেষে ভিসি স্যার উপস্থিত হলে শিক্ষারথীরা তার জন্যে মানব শিকল তৈরি করে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাধ্যমে তাঁকে অডিটোরিয়াম পর্যন্ত পৌছে দেয়।





ভিসি স্যার উপস্থিত হলেই শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা সভা শুরু হয়। এ সময় মাননীয় উপাচার্য মহোদয় শিক্ষার্থীদের ১০টি দাবিই শুনেন এবং এর সব কয়টি পূরণের আশ্বাস দেন। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে আবরার ফাহাদের হত্যায় অভিযুক্ত সকলকে সাময়িকভাবে বহিস্কার করেন। তিনি আরও জানান পুংখানুপুংখ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই আজীবন বহিস্কার করা সম্ভব নয়। মামলা চলাকালীন সকল খরচ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে এবং আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, এমন দাবিতে তিনি বলেন যে আবরারের পরিবার যে ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করবে, তাদেরকে সেটাই দেয়া হবে। বুয়েটে সাংগঠনিক রাজনীতি বন্ধের ব্যপারে মাননীয় ভিসি বলেন,  তিনি তাঁর নিজস্ব ক্ষমতাবলে এই মুহূর্তে বুয়েটে সকল প্রকার সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করছেন। এ পর্যায়ে তাকে সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকাটা চিরস্থায়ী কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন “চিরস্থায়ী তো তুমিও না, আমিও না!"





উল্লেখ্য বুয়েটের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি সব সময়ই নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু এটি কখনোই কার্যকর হয় নি। ২০০২ সালে রাজনৈতিক হানাহানির পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েট কেমিকৌশল ‘৯৯ ব্যাচের ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি প্রাণ হারান। তখন পুনরায় বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ক্ষমতালোভীদের আগ্রাসন এবং বুয়েট প্রশাসনে সদিচ্ছার অভাব এবং সঠিক নিয়ন্ত্রণের অভাবে ছাত্র রাজনীতি বারবার ফিরে আসে ক্যাম্পাসে।





এছাড়াও উপাচার্য মহোদয় বাকি সবগুলো দাবি মেনে নেয়া হবে বলে শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দেন। সবশেষে তিনি শিক্ষার্থীদের  অনুরোধ করেন ১৪ অক্টোবর আসন্ন বুয়েটে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানে যেন শিক্ষার্থীরা সহযোগীতা করে। তবে শুধুমাত্র মৌখিক আশ্বাসেই পরিতৃপ্ত হয় না শিক্ষার্থীরা, তারা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়। তাদের এই চাওয়ার পেছনে আছে পূর্বের বিভিন্ন আন্দোলনে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানোর পর সেই আশ্বাস পূরণ না করার ইতিহাস। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয় যেসব দাবি মেনে নেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব,অন্তত সেগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা হবে না। এই মিটিং এর তাৎপর্য অনেক গভীর ছিলো। বুয়েটে দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ ছাত্ররাজনীতি (যা কার্যত সক্রিয় ছিল) পুনরায় ভিসির আদেশে নিষিদ্ধ হলো। এরই প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অবস্থিত লীগ কর্নারে গিয়ে সাদা রঙ দিয়ে বুয়েট ছাত্রলীগের লোগো মুছে দেয়। সেই সাদা রঙ দিয়েই ডেল ক্যাফের লীগ কর্নারের দিকের দেয়ালে “মুক্তি কর্নার” লিখে দেয়া হয়।













১১ অক্টোবর ২০১৯, সন্ধ্যা সাতটার সময় জন্ম নেয় “মুক্তি কর্নার”





ভিসির সাথে আলোচনার প্রায় ঘন্টাখানেক পর শিক্ষার্থীরা প্রেস ব্রিফিং করে তাদের সিদ্ধান্ত জানান। এসময় তারা জানান, যেহেতু ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিবেশ ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য অনুকূল নয় এবং পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এখনো সুনিশ্চিত নয়, তাই পরিবেশ অনুকূল হওয়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ৫টি দাবি পূরণ করতে হবে। এই দাবিগুলো যেদিনই কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে পূরণ করা হবে, তার পরের যেকোনো দিনই ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারবে। তবে এই দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বুয়েট ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারবে না। আবার, এ পাঁচটি দাবি পূরণ হয়ে গেলে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারলেও , শিক্ষার্থীদের ১০ টি দাবির প্রতিটি সম্পূর্ণভাবে পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না, এবং শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরে যাবে না। তাদের উল্লিখিত পাঁচটি দাবি হলোঃ





১) আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় জড়িত সকলকে এই মুহূর্ত থেকে সাময়িক বহিষ্কার করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে চার্জশীটে অভিযোগ আসবে,তাদেরকে অবিলম্বে বুয়েট প্রশাসন স্থায়ী বহিষ্কার করবে এই মর্মে অফিশিয়াল নোটিশ দিতে হবে।





২) আবরার হত্যা মামলার সকল খরচ বুয়েট প্রশাসন বহন করবে এবং আবরার ফাহাদের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ বুয়েট কর্তৃপক্ষ দিতে বাধ্য থাকবে এই মর্মে অফিশিয়াল নোটিশ অবিলম্বে দিতে হবে।





৩) বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ এই মর্মে নোটিশ দিতে হবে। সকল হল থেকে অবৈধ ছাত্র (যাদের বুয়েটে শিক্ষাকাল শেষ) এবং অবৈধ ভাবে হলের সিট দখলকারীদের (যারা হলে একাধিক সিট দখল করে রাখে) উৎখাত করতে হবে, সাংগঠনিক ছাত্র সংগঠন গুলোর অফিসরুম সিলগালা করতে হবে। সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার পরে ভবিষ্যতে কেউ এরূপ সাংগঠনিক কার্যক্রমে জড়িত থাকলে কিংবা কোনোরূপ ছাত্র নির্যাতনে জড়িত কাউকে পাওয়া গেলে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিবে-তা বিস্তারিত নোটিশে জানাতে হবে এবং পরবর্তীতে এটি অর্ডিনেন্সে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও নোটিশে উল্লেখ করতে হবে। এ ধরনের কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি কমিটি গঠন করে অফিশিয়াল নোটিশ আকারে দিতে হবে।





৪) বুয়েটে পূর্বে ঘটে যাওয়া সকল ছাত্র নির্যাতন, হয়রানি ও র‍্যাগিং এর ঘটনা এবং ভবিষ্যতে ঘটা এরূপ যেকোনো ঘটনা প্রকাশের জন্য BIIS একাউন্টে একটি ‘Common Platform’ সংযুক্ত করতে হবে। এর পূর্ণ মনিটরিং ও শাস্তি বিধানের জন্য কমিটি গঠন করে অবিলম্বে অফিশিয়াল নোটিশ আকারে দিতে হবে।





৫) প্রত্যেক হলের সবগুলো ফ্লোরের সকল উইংয়ের দুইপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা সংযুক্ত করতে হবে এবং অতিদ্রুত সিসিটিভি ফুটেজের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে সার্বক্ষণিক মনিটরিং নিশ্চিত করতে অফিশিয়াল নোটিশ দিতে হবে।





এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১১ তারিখ রাতে বুয়েট কর্তৃপক্ষ একটি অফিস আদেশ ও চারটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। আদেশ ও বিজ্ঞপ্তি গুলোঃ