আবরারকে লেখা প্রেয়সীর চিঠি

Share this


প্রিয় আবরার,





 কেমন আছো? জানি ভালো নেই, কখনো কাউকে কাঁদিয়ে ভালো থাকো নি। আজ আর ভালো থাকবে কি করে, তাইনা? আজ তো বিশ্ব  কেঁদে যাচ্ছে, বিশ্বের সকল মানুষ কেঁদে যাচ্ছে। এদের কাঁদিয়ে মোটেও ভালো থাকবার কথা নয়। আচ্ছা যাই হোক, এখন বলো তো তোমার ওই শহরটা কতটা নিরাপদ? ওপারের আকাশ কতটা অসীম? কখনো ভুল বারান্দায় পা রাখো?  রোজ বিকেলে ঘুরতে বের হও? ওখানকার বন্ধুরা কেমন? হিংস্র নয় তো? মনে আছে? কত গর্ব করতে বন্ধুদের নিয়ে, সিনিয়র ভাইদের নিয়ে। আজ কোথায় গেল তোমার সে গল্প, এত এত গর্ব? জানো ওরা যখন তোমাকে লাশবাহী এম্বুলেন্সে করে নিয়ে গেল আমার খুব পিছু পিছু দৌড়াতে ইচ্ছে করছিল আর ডাকতে ইচ্ছে করছিল "আবরার, আবরার। তোমার সাথে আবার দেখা হবে তো আবরার?" তোমায় যখন বাক্সে তোলে অপহন্তাদের  মুখ দেখেছিলে? যারা কতটা পাষাণ বেঁধে তোমার বুকে ছোড়া বসালো?





আচ্ছা বলো তো তোমার রায়হার কথা মনে পড়ে? যে তোমায় দেখতে ভোর জানালায় দাঁড়াতো, এক ফোঁটা ইশারা কেটে অমনি চলে যেতে। জানো, রায়হা না রোজ কাঁদে। খুব কাঁদে। ভাত খায় না। বলো তো তোমাদের ওখানে কত রকমের ফুল ধরে? কখনো রায়হার জন্য তুলে রাখো? তোমার নামে শহরে-শহরে কত মিছিল হয়, স্লোগান হয় রাস্তায় অলিতে-গলিতেও মাইকিং হয়, এগুলো শুনতে পাও? দেখতে পাও? কেউ তোমাকে বলেনি, না? জানো? আজ না প্ল্যাকার্ড হাতেও সবাই শহীদ মিনারের বেদি ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে, "আমার ভাইয়ের বিচার চাই, বিচার চাই"  বলে। সেদিন কিন্তু ওদের লক্ষ-কোটিবার ভাই ডেকেও পার পাওনি।





জানো, কত পত্রিকায় তোমাকে ছাপে, কত চ্যানেলে তোমাকে দেখায়- এমন কিন্তু আগে চাইতে। ইয়া বড় লেখক হবে, পত্রিকা লিখবে অথচ সবাই তোমাকে চিনবে। দেখলে মুহূর্তেই কেমন পাল্টে গেল সবটা? তোমাকে নিয়ে কত-শত লেখে জানো ?মন্ডলবাড়ি তোমার কীর্তন করে। বলে ছেলেটা বাড়ির উপর দিয়ে যাওয়া-আসা করতো ।কত ভালো ছিলো। কত প্রশংসা করে তোমার। তুমি নাকি মরেছো! এ কথা বিশ্বাস করি নাহ। সত্যিই কি মরেছো? নাকি মরে গিয়ে বেঁচেছো? জানো, ওরা না কেউ বাঁচতে পারে নাই। বেঁচে থেকেই বারবার মরেছে। পঁচে পঁচে মরেছে, ধিক্কারে ধিক্কারে  মরেছে, প্রতিবাদে প্রতিবাদে মরেছে।





আবরার, তোমার জন্য রহিম চাচা কত কাঁদে। তুমি নাকি সন্ধ্যা এলে উনার দোকানে এসে চা খেয়ে হলে আসতে? মাঝেমধ্যে ভুলো মনে বিল না দিয়ে চলে যেতে আবার জিহবায় দাগ কেটে ফিরে আসতে, "উফ কাকা, পড়ার টেনশানে ভুলে গেছি। এই নিন।" রহিম কাকা টাকা নিত আর ভাবতো- ছেলেটা কত সরল, মনে করে ফিরে তো আসে। অন্যরা তো মন মত খেয়ে চলে যায়। বিল দেওয়ার কথা বললেও গাঁয়ে ধেয়ে আসে। জানো,আজ না রহিম কাকা তোমার নামে নকশা নীল আকে। আচ্ছা বলোতো এখন একই সন্ধ্যা এলে চা খাও? কেউ বানিয়ে দেয় সুগার ছাড়া? হলের বন্ধুরা ক্ষ্যাপায়- প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে যাবি নাকি? যে এত ওয়াশরুমে সময় কাটাস? তুমি তখন কি বলতে? রায়হা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে? এটা বলতে? বিশ্বাস করো একদমই ছেড়ে যায়নি। কখনো খোলা আকাশে কালো মেঘের ভেলায় ভেসে আসলে দেখতে পাবে, ছাদ ধসে জানালার রেলিং বেয়ে টুপটাপ জল গড়িয়ে পড়ছে। লোকে জানবে উপরে মেঘ, আর নিচে বৃষ্টি। কিন্তু আমি জানবো- উপরে তুমি এবং নিচে আমার চোখের জল। ভালো থেকো  আবরার, জানো তো এসাইনমেন্ট কত ঝামেলার? এখন সে ঝামেলার কাজটাই আমাকে করতে হবে। পারলে আমাকে লিখো, আর লিখো এই ঠিকানায়-





ইতি তোমার ,





প্রথম দেখা সকাল।